বৃহস্পতিবার, ৪ নভেম্বর, ২০২১

টক্সিন কি? কিভাবে বুঝবেন শরীরে টক্সিন বেড়ে গেছে ?টক্সিন দূর করার উপায়?

 টক্সিন কি? কিভাবে বুঝবেন শরীরে টক্সিন বেড়ে গেছে ?টক্সিন দূর করার উপায়?


 টক্সিন অর্থ বিষ। মানব দেহে যে টক্সিন থাকে সেগুলো আসলে ক্ষতিকারক বা বিষাক্ত কোন পদার্থ ।এগুলো বাইরের পরিবেশ থেকে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে । বিভিন্ন ভাবে মানব দেহে টক্সিন প্রবেশ করতে পারে যেমনঃ

১. খাবারের মাধ্যমে

২. শ্বাস-প্রশ্বাস এর মাধ্যমে বিভিন্ন ভারী ধাতু গ্রহন করলে

৩. ধুমপান বা মদ্যপানের মাধ্যমে

৪. কলকারখানা বা গাড়ির জ্বালানি ধোঁয়ার মাধ্যমে

৫. রেডিয়েশন এর জন্য

৬. কীটনাশক ব্যবহার করা ফলমূল বা শাক সবজি খেলে


এসব টক্সিক পদার্থ আমাদের শরীরে থাকলে এর বিভিন্ন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। যার ফলে স্বাভাবিক জীবন যাত্রা ব্যাহত হয়। মানব শরীর থেকে টক্সিন বের করে ফেলার প্রক্রিয়া কে বলে ডিটক্সিফিকেশন।টক্সিক পদার্থ থাকে মুলত রক্তে তাই ডিটক্সিফিকেশন এর অর্থ রক্ত পরিষ্কার করাে রক্ত থেকে দূষিত পদার্থ দূর করার মাধ্যমে এটি করা হয়। কিডনি, অন্ত্র, ফুসফুস, এবং ত্বকের মাধ্যমেও আমাদের শরীর বিষাক্ততা দূর করে।কিন্তু যখন এই অঙ্গ গুলো সঠিক ভাবে কাজ না করে তখন রক্ত থেকে ডিটক্সিফিকেশন হয় না এবং শরীরে এর বিরূপ প্রভাব পরে।


কিভাবে বুঝবেন আপনার শরীরে টক্সিন বেড়ে গেছে?


১. কোষ্ঠকাঠিন্য

নিয়মিত মল ত্যাগের ফলে আমাদের শরীর থেকে বিভিন্ন টক্সিন বের হয়। মল ত্যাগ যদি নিয়মিত না হয় তবে বুঝতে হবে শরীরে টক্সিন জমা হচ্ছে।


২. ওজন বেড়ে যাওয়া

কিছুই খাচ্ছেন না অথচ হুহু করে ওজন বেরেই চলছে তাহলে বুঝতে হবে শরীরে টক্সিন আছে।সাধারনত ফাস্টফুড, চিনি যুক্ত খাবার, ক্যানবন্দি খাবার, জাংক ফুড অতিরিক্ত খেলে এক সময় এভাবে ওজন বেড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে ।


৩. অল্পতেই ক্লান্তি

প্রতিদিনের কাজ কর্ম করতেই হাপিয়ে উঠছেন।অফিস থেকে বাসায় ফিরে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে আর উঠতে ইচ্ছা করছে না।তাহলে বুঝবেন টক্সিনের মাত্রা বেড়ে গেছে ।


৪. চর্ম রোগ

শরীরে প্রবেশ করা বিভিন্ন টক্সিন যখন অন্ত্র বা লিভার বের করতে পারে না তখন সেই টক্সিন বের করার দায়িত্ব নেয় ত্বক।আর এর ফলেই ত্বকে দেখা দেয় বিভিন্ন চর্ম রোগ জেমনঃ ফোঁড়া বা র‍্যাশ।


৫. মাথা ব্যাথা

অনেক সময় টক্সিনের জন্য মাথা ব্যাথা অর্থাৎ মাইগ্রেনের সমস্যাও দেখা দিতে পাথা


৬. পেশিতে ব্যাথা

কোন চোট লাগেনি অথচ বিভিন্ন পেশিতে ব্যাথা শরীরে টক্সিন বেড়ে যাওয়ার লক্ষন।


৭. শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া ও প্রচুর ঘাম হওয়া

শরীরে যখন অতিরিক্ত টক্সিন জমে যায় তখন তা রক্তের মাধ্যমে কিডনিতে যায়।কিডনি সেই টক্সিন মিশ্রিত রক্ত পরিশোধন করতে অতিরিক্ত কাজ করে যার ফলে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায় ও প্রচুর ঘাম হয়।


৮. নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ

প্রসেসড ফুড খাওয়ার ফলে শরীরে অতিরিক্ত শর্করা জমে যায় ফলে তৈরি হয় ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া যা অন্ত্রে তো বটেই বাসা বাধে মুখের ভিতরেও যার কারনে মুখে হয় দুর্গন্ধ ।


৯. অনিদ্রা

আপনার যদি রাতে ঘুম না হয় অর্থাৎ আপনি যদি অনিদ্রায় ভোগেন তাহলে বুঝবেন আপনার শরীরে টক্সিন বেড়ে গেছে ।


১০. পেটে অতিরিক্ত মেদ জমা

শরীরে টক্সিনের মাত্রা বেড়ে গেলে গ্লুকোজের লেভেল ঠিক থাকে না এর সাথে কোলেস্টেরল সঠিক ভাবে কাজে লাগে না ফলে পেটে মেদ জমে যায় ।


প্রাকৃতিক উপায়ে যেভাবে শরীর কে টক্সিন মুক্ত করবেনঃ


১. নিয়মিত গ্রীন টি পান করতে পারেন টক্সিন কমানোর জন্য।

২. মাইক্রো ওয়েভ ওভেন ব্যবহার কমিয়ে ফেলা কারন এতে খাবারে টক্সিন প্রবেশ করে।

৩. প্রচুর পরিমানে পানি পান করতে হবে এতে মুত্রের মাধ্যমে শরীর থেকে টক্সিন বের হবে।

৪. থালা বাসন ধোয়ার সাবান বা ডিটারজেন্টে টক্সিন আছে কিনা তা জানতে হবে।

৫. নিয়মিত ডিটক্স ওয়াটার পান করতে পারেন এটা শরীর থেকে টক্সিন বের করার হার বাড়ায়।

৬. একই তেলে দুবার রান্না করা যাবে না কারন এতে তেল অক্সিডাইজড হয়ে যায় এবং টক্সিনে রুপান্তরিত হয় ।

৭. বাজারে যেসব এয়ার ফ্রেশনার বা সুগন্ধি মোম পাওয়া যায় এগুলোতে টক্সিন থাকে তাই এসব ব্যবহার না করা ।

৮. কাঁচা শাক সবজি বা ফলমূল ভালো করে ধুয়ে তারপর রান্না করা বা খাওয়া।

যাতে এগুলোতে কোন টক্সিন থাকলে তা বের হয়ে যায়।

রবিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২১

আল কোরআন, রমযানের রোযা ও তার শিক্ষা --- ডাঃ এস. এম. আখতারুজ্জামান(সুমন)

 আল কোরআন, রমযানের রোযা ও তার শিক্ষা

ডাঃ এস. এম. আখতারুজ্জামান(সুমন)


সাওম বা রোযার অর্থ ঃ

বিরত থাকা বা ফিরে থাকা। সুবেহ সাদিক হতে ইফতার এর আগ মুহুর্ত (সূর্যাস্ত) পর্যন্ত কোন রকম পানাহার ও যৌন সম্ভগ হতে বিরত থাকার নাম ই রোযা বা সাওম। অবশ্য সকল প্রকার পাপ থেকে বিরত থাকার নাম ই রোযা বা সাওম।

হাদীস ঃ রাসূল (সা) বলেছেন : “যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ও তদনুযায়ী আমল করা বর্জন করেনি, তার রোযা রাখার মাধ্যমে পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই”। (মিশকাত)

রাসূল (সা) বলেছেন : এমন অনেক রোযাদার আছে, যে রোযায় ক্ষুধা- তৃষ্ণা ভোগ করা ছাড়া তাদের নেকির পাল্লায় আর কিছু পড়ে না। (মিশকাত)

শিক্ষা ঃ আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালন করা ও সকল প্রকার পাপ থেকে নিজেকে পবিত্র রেখে তাকওয়া অর্জন করাই রোযার মূল শিক্ষা।

রোযা যাদের উপর ফরযঃ 

হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোযা ফরয করে দেয়া হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী নবীদের অনুসারীদের ওপর ফরয করা হয়েছিল। এ থেকে আশা করা যায়, তোমাদের মধ্যে তাকওয়ার (আল্লাহ ভীরুতার) গুণাবলী সৃষ্টি হয়ে যাবে। (সূরা বাকারা- ১৮৩) 

উক্ত আয়াতে ‘হে ঈমানদারগণ’ বলে সম্বোধন করে ঈমানদারদের উপর আল্লাহ রমজানের রোযাকে ফরজ করেছেন।

ঈমানের সংজ্ঞা ঃ

আমরা জানি ঈমান তিনটি কাজের সাথে সম্পর্কযুক্ত। ১. অন্তরে দৃঢ় বিশ^াস করা, ২. মুখে স্বীকার করা, ৩ বাস্তব জীবনে তার (ইসলামের সকল বিষয়ে) বাস্তবায়ন করার নামই ঈমান।

রমযানের রোযা ফরজ হওয়ার প্রেক্ষাপটঃ

রাসূল (সা:) এর দ্বিতীয় হিজরীতে রমজান মাসে মুসলিম বাহীনি ও কাফের-মুশরিক বাহীনির অর্থাৎ বাতিল মতাদর্শের সাথে বা মানব রচিত মতবাদদের মধ্যে বদর যুদ্ধ সংগঠিত হয়। ইসলাম টিকে থাকবে কি থাকবেনা এমন পরিস্থিতিতে বদর যুদ্ধ সংগঠিত হয়। বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহনকারী ঈমানদ্বারদের উপর আল্লাহ খুশি হয়ে ১৭ই রমজান রোযাকে ফরজ করেছেন। 

শিক্ষাঃ যারা কুরআন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে লিপ্ত থাকবে তাদের মত ঈমানদারদের উপর রমজানের রোযা ফরজ। এখন যারা কুরআন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে লিপ্ত নেই রমজান তাদেরকে কুরআন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশগ্রহনের জন্য আহবান করে।

রোযা ফরজ হওয়ার উদ্দেশ্যঃ

সূরা বাকারার ১৮৩ নং আয়াতের শেষে “আশা করা যায়, তোমাদের মধ্যে তাকওয়ার (আল্লাহ ভীরুতার) গুণাবলী সৃষ্টি হয়ে যাবে।”

তাকওয়ার উদাহরণঃ যখন কোন ব্যক্তি গভীর বনের মধ্য দিয়ে পার হয়, তিনি জানেন সেখানে জীবন নাশ করা জন্তু জানোয়ার আছে, যে কোন সময় আক্রমন করে জীবন শেষ করে দিতে পারে। তখন তিনি প্রতিটি পদক্ষেপ খুব সাবধানে ফেলবেন। এমনকি এক পা সামনে দিলে ভয়ে বা শতর্কতাবশত দুই পা পিছনে ফিরে আসে। এর নাম হচ্ছে দুনিয়ার জীবন নাশের ভয়। ঠিক তেমনি দুনিয়াটা একটি গভীর বন - জংগল। এই বনে প্রতিটি মুহুর্তে আল্লাহর সাথে নাফারমানী, রাসূল (সাঃ) এর সাথে দুশমনি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাই আল্লাহর ভয়ে দুনিয়ায় প্রতিটি পদক্ষেপ ভেবে চিন্তে ফেলতে হবে এবং সন্দেহ থাকলে সে কাজ থেকে ফিরে এসে সন্দেহমুক্ত কাজ করতে হবে এবং সব সময় আল্লাহর পছন্দ অপছন্দ দেখে অপছন্দ কাজ পরিহার করে পথ চলার নামই তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতি। অবশ্য সরাসরি কুরআন-হাদীস থেকে জ্ঞান অর্জন করে তাকওয়া অর্জন করা সহজ হবে।

আল কুরআনে তাকওয়া ঃ

“(আজ তারাই এ রহমতের অংশীদার) যারা এ প্রেরিত উম্মী নবীর আনুগত্য করে, যার উল্লেখ নিকট এখানে তাওরাত ও ইনজিলে লিখিত অবস্থায় পাওয়া যায়। সে তাদের সৎ কাজের আদেশ দেয়, অসৎকাজ থেকে বিরত রাখে, তাদের জন্য পাক পবিত্র জিনিসগুলো হালাল ও নাপাক জিনিসগুলো হারাম করে এবং তাদের ওপর থেকে এমন সব বোঝা নামিয়ে দেয়। যা তাদের ওপর চাপানো ছিল আর এমন সব বাঁধন থেকে তাদেরকে মুক্ত করে যাতে তারা আবদ্ধ ছিল। কাজেই যারা তার প্রতি ঈমান আনে, তাকে সাহায্য সহায়তা দান করে এবং তার সাথে অবতীর্ন আলোক রশ্মিও (কুরআন) অনুসরন করে তারাই সফলতা লাভের অধিকারী”। (সূরা আল আরাফ- ১৫৭)

“হে ঈমানদারগণ! আল্লাকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সহযোগি হও”। (সূরা আত তাওবা- ১১৯)

“হে ঈমানদারগণ! সত্য অস্বীকারকারীদের মধ্যে যারা তোমাদের নিকটবর্তী তাদের সাথে যুদ্ধ করো। তারা যেন তোমাদের মধ্যে কঠোরতা দেখতে পায়। জেনে রেখো আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে আছেন”। (সূরা আত তাওবা- ১২৩)

“কাজেই তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং (নির্দ্বিধায়) আমার (রাসূলের) আনুগত্য করো”। সূরা আশ-শুআরা ১০৮,১১০,১২৬,১৩১,১৪৪,১৫০,১৬৩,১৭৯)

“হে ঈমানদাররা, আল্লাহকে ভয় করো। আর প্রত্যেকেই যেন লক্ষ্য রাখে, সে আগামীকালের জন্য কি প্রস্ততি নিয়ে রেখেছে। আল্লাহকে ভয় করতে থাক। আল্লাহ নিশ্চিতভাবেই তোমাদের সেই সব কাজ সম্পর্কে অবহিত যা তোমরা করে থাক”। (সূরা আল-হাশর - ১৮)

“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিৎ তেমনিভাবে ভয় করতে থাকো। এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরন করো না”। (সূরা আল ইমরান - ১০২)  

আল হাদীসে তাকওয়াঃ

আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে তার উপর যুলুম করবে না, তাকে অসহায় অবস্থায় পরিত্যাগও করবে না এবং তাকে তুচ্ছ জ্ঞান করবে না। তিনি নিজের বুকের দিকে ইশারা করে বলেন, তাকওয়া এখানে, তাকওয়া এখানে, তাকওয়া এখানে। কোন লোকের নিকৃষ্ট সাব্যস্ত হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ জ্ঞান করে। প্রতিটি মুসলমানের জীবন, ধন-সম্পদ ও মান-সম্মান সকল মুসলমানের সম্মানের বস্তু(এর উপর হস্তক্ষেপ করা তাদের জন্য হারাম) । (মুসলিম)

হাসান ইবনে আলী (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ (সা) এর জবান মুবারক হতে এই কথা মুখস্ত করে নিয়েছি , যে জিনিস সংশয়ের মধ্যে ফেলে দেয় তা পরিত্যাগ করে যা সন্দেহের উর্ধে তা গ্রহণ কর। কেননা সততাই শান্তির বাহন এবং মিথ্যাচার সন্দেহ সংশয়ের উৎস। (তিরমিযী)

আয়েশা (রা) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, হে আয়েশা! ছোটখাট গুনাহর ব্যাপারেও সতর্ক হও। কেননা এ জন্যও আল্লাহর কাছে জওয়াবদিহি করতে হবে। (ইবনে মাজা)

শিক্ষা ঃ পরকালে আল্লাহর আযাব, কেয়ামতের কঠিন ময়দানে দুনিয়ার সকল সময়ের ও কাজের হিসাব দিহিতা ও আল্লাহর ভয় সৃষ্টির মাধ্যমে আল্লাহ ও রাসূল (সা) এর আনুগ্রত্যর মাধ্যমে জীবন পরিচালনা করার নাম ই তাকওয়া। যে শিক্ষা রোযার মাধ্যমে তৈরি করার সম্ভাবনার কথা আল্লাহ ঘোষণা করেছেন।

রমযান মাসে কিছু লোভনীয় অফার বা তাৎপর্য ঃ 

রোযার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে মহানবী (সা) বলেন : “মানুষের প্রতিটি নেক কাজের ফল দশগুন থেকে সাতাশগুন পর্যন্ত বৃদ্ধি হয়ে থাকে। কিন্তু মহান আল্লাহ বলেন, রোযা এর ব্যতিক্রম। কারণ, রোযা বিশেষভাবে কেবলমাত্র আমারই জন্য রাখা হয়। আর আমি নিজেই এর প্রতিদান দান করবো। (বুখারী, মুসলিম)

রাসূল (সা) বলেছেন : “যে ব্যক্তি ঈমান ও সচেতনতার সাথে রমযানের রোযা রাখে তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আলমগীরি)

রাসূল (সা) বলেছেন : যখন রমযানের প্রথম রাত আসে, তখন শয়তান ও অবাধ্য জীনগুলোকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। দোজখের সকল দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়, তার কোন একটা দরজাও খোলা রাখা হয় না। জান্নাতের সকল দরজা খুলে দেয়া হয়, তার একটি দরজা ও বন্ধ রাখা হয় না। তারপর আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন আহবানকারী বলতে থাকে, যারা মঙ্গল ও কল্যাণ চাও তারা এগিয়ে এসো। আর যারা পাপাচার করতে চাও, তারা থাম। তারপর আল্লাহর পক্ষ থেকে অনেক গুনাহগার বান্দাকে দোজখ থেকে মুক্তি দেয়া হয়। আর এ কাজ রমজানের প্রতি রাতেই হয়। (তিরমিযি, ইবনে মাজাহ)

রমযান মাস এমন একটি মাস যে মাসে মুমিনদের রুজি বৃদ্ধি করা হয়।(মিশকাত)

রমযান মাসে কেউ যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কোনো নফল ইবাদত করে, সে অন্য মাসের ফরজ ইবাদতের সওয়াব পাবে। আর যে একটি ফরয আদায় করবে সে অন্য মাসের সত্তরটি ফরয ইবাদতের সওয়াব পাবে। (মিশকাত)

“রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশকের সুগন্ধী থেকেও উৎকৃষ্টতম”। রোযা গুনাহ থেকে আত্মরক্ষার ঢালস্বরূপ”। (সহীহ বুখারী)

রোযার মাস এত মর্যাদাপূর্ণ হওয়ার কারণ ঃ

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পৃথিবীতে এক বছরকে ১২ টি মাসে, এক মাস কে ৩০/৩১ দিনে ভাগ করেছেন। আল্লাহর তৈরি করা প্রতিটি মাস বা দিন সমান। কোন মাস বা দিনের আলাদা তেমন কোন গুরুত্ব নেই। কিন্তু রমযান মাস কে কেন এত গুরুত্বপূর্ন বলা হলো? কেন এত অফার প্রদান করলেন? 

পৃথিবীতে মানব সৃষ্টির শুর থেকে শেষ নবী পর্যন্ত নবীদের মাধ্যমে যত মুজিজা এসেছে এবং যে মুজিজার সূফলতা বিচার দিবস পর্যন্ত থাকবে তার মধ্যে শ্রেষ্ঠতম মুজিজা হচ্ছে আল কুরআন। যা আল্লাহর নিজস্ব ভাষা এবং লওহে মাহফুজে সংরক্ষিত ছিল। এই শ্রেষ্ঠ মুজিজা আমাদের পিয় নবী মুহাম্মাদ (সা) এর উপর নাযিল হয়। যে মুজিজা নাযিল হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন- যদি পাহাড়ের উপর এই কুরআন নাযিল করা হতো তাহলে তুমি দেখতে পেতে তা আল্লাহর ভয়ে ধসে পড়েছে এবং ফেটে চেীচির হয়ে যাচ্ছে।(সূরা আল হাশর - ২১)। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই শ্রেষ্ঠ কিতাব, সংবিধান, গাইডলাইন রমযান মাসে নাযিল করেছেন বলে এই রমযান মাস কে এত গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআন নাযিল উপলক্ষে সূরা কদরের প্রথম আয়াতে বলেছেন - “আমি এই কুরআনকে  কদরের রাতে অবতীর্ণ করেছি”। আর আল্লাহ এই কুরআনকে লাইলাতুল কদরে নাযিল করার কারনে লাইলাতুল কদরকেও বিশেষ সন্মানে ভ’ষিত করলেন। “লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম” । (সূরা আল কদর- ৩)

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন রমযান মাসে এই কুরআন নাযিল নিয়ে সূরা বাকারার ১৮৫ নং আয়াতে বলেছেন- রমযানের মাস, এই মাসেই কুরআন নাযিল করা হয়েছে। 

শিক্ষা ঃ ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক জীবন পর্যন্ত আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যে সংবিধান, গাইডলাইন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কিতাব আল-কুরআন নাযিল করেছেন তা এই পবিত্র রমযান মাসে। তাই এই রমযান মাসকে কুরআনের উছিলায় এত মর্যদাপূর্ণ করা হয়েছে। 

কুরআন কি?

আল্লাহ তোমার ওপর কিতাব ও হিকমত নাযিল করেছেন, এমন সব বিষয় তোমাকে শিখিয়েছেন যা তোমার জানা ছিল না এবং তোমার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ অনেক বেশি।  সূরা নিসা-– ১১৩

আমি একে আরবী ভাষায় কুরআন বানিয়ে নাযিল করেছি, যাতে তোমরা একে ভালোভাবে বুঝতে পারো।   সূরা ইউসুফ - ২

এভাবেই  (হে মুহাম¥াদ), আমি আমার নির্দেশে তোমার কাছে দ্বীনের এ রুহকে অহী করে পাঠিয়েছি। নতুবা তুমি আদৌ জানতে না কিতাব কি এবং ঈমানই বা কি?  সূরা  আশ শুরা - ৫২

আল্লাহ সর্বোত্তম বাণী নাযিল করেছেন, এমন একটি গ্রন্থ যার সমস্ত অংশ সামঞ্জস্যপূর্ণ। সূরা আয যুমার - ২৩

তারপর আমি এমন লোকদেরকে এ কিতাবের উত্তরাধিকারী করেছি যাদেরকে আমি (এ উত্তরাধিকারের জন্য) নিজের বান্দাদের মধ্য থেকে বাছাই করে নিয়েছি। সূরা ফাতের - ৩২

আমি এদের কাছে এমন একটি কিতাব নিয়ে এসেছি  যাকে পূর্ণ জ্ঞানের ভিত্তিতে বিশদ ব্যখ্যামূলক করেছি এবং যা ঈমানদারদের জন্য পথ নির্দেশনা ও রহমত স্বরুপ। সূরা আল আরাফ- ৫২

এটি এমন এক গ্রন্থ যার আয়াতসমুহ সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। আরবী ভাষার কুরআন, সেই সব লোকেদের জন্য যারা জ্ঞানের অধিকারী। সূরা হা-মীম আস সাজদাহ - ৪১


তিনিই তোমাদের প্রতি এ কিতাব নাযিল করেছেন। সূরা আলে ইমরান - ০৭

হে লোকেরা! আমি তোমাদের  প্রতি এমন একটি কিতাব অবতীর্ণ করেছি যার মধ্যে তোমাদেরই কথা আছে, তোমরা কি বুঝ না ?  সূরা আল আম্বিয়া - ১০ 

আরো তথ্যের জন্য- ১৬/৮৯, ৪২/১৭,  ৬/৫৯, ৬/১১৪, ৫/১৫, ৪১/৩, ৪৩/২, ৪৪/২, ৭/১৯৬, ১০/১, ৬১, ২/১৪৬, ১৭৪, ২১৩ নং আয়াত দ্রষ্টব্য।

কুরআন কেন?

এটি আল্লাহ ভীরুদের হিদায়াতের জন্য। সূরা বাকারা -২

যা মানবজাতির জন্য পুরোপুরি হিদায়াতের জন্য। সূরা বাকারা - ১৮৫

রমজান মাস, এ মাসেই কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা মানবজাতির জন্য পুরোপুরি হিদায়াত এবং এমন দ¦্যর্থহীন শিক্ষা সম্বলিত, যা সত্য- সঠিক পথ দেখায় এবং হক ও বাতিলের পার্থক্য সুস্পষ্ট করে দেয়। বাকারা- ১৮৫

আমি এ কুরআনকে উপদেশ লাভের সহজ উৎস বানিয়ে দিয়েছি। এমতাবস্থায় উপদেশ গ্রহনকারী কেউ আছে কি? সূরা আল ক্বামার - ১৭,২২,৩২,৪০।

হে নবী! আমি সত্য সহকারে এই কিতাব তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আল্লাহ তোমাকে যে সঠিক পথ দেখিয়েছেন সেই অনুযায়ী তুমি লোকদের মধ্যে ফায়সালা করতে পারো। তুমি খেয়ানতকারী ও বিশ^াস ভংগকারীদের পক্ষ থেকে বিতর্ককারী হয়ো না। আন নিসা- ১০৫।

এটি তোমার প্রতি নাযিল করা একটি কিতাব। কাজেই তোমার মনে যেন এর সম্পর্কে কোন সংকোচ না থাকে। এটি নাযিল করার উদ্দেশ্য  হচ্ছে, এর মাধ্যমে তুমি অস্বীকারকারীদের ভয় দেখাবে এবং মুমিনদের জন্য এটি হবে একটি স্মারক। আল আরাফ- ২।

এটা হচ্ছে পথ নির্দেশ ও সুসংবাদবাহী গ্রন্থ মুমিনদের জন্য। সূরা আন নামল - ০২

বড়ই বরকত সম্পন্ন তিনি যিনি এ ফুরকান তাঁর বান্দার ওপর নাযিল করেছেন যাতে সে সারা বিশ^াসীর জন্য সতর্ককারী হয়।সূরা আল- ফুরকান - ১।

আমি এদের কাছে এমন একটি কিতাব নিয়ে এসেছি  যাকে পূর্ণ জ্ঞানের ভিত্তিতে বিশদ ব্যখ্যামূলক করেছি এবং যা ঈমানদারদের জন্য পথ নির্দেশনা ও রহমত স্বরুপ। সূরা আল আরাফ- ৫২

আরো তথ্যের জন্য - ১৪/১, ৫৪/২২,৩২,৪০, ১৬/৮৯, ৬৪, ৭/২০৩, ৪১/৪৪ নং আয়াত দ্রষ্টব্য। 

সন্দেহ দুর - 

এটি আল্লাহর কিতাব, এর মধ্যে কোন সন্দেহ নেই। সূরা বাকারা - ২

এ কিতাবটি রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ, এতে কোন সন্দেহ নেই। আস সাজদাহ -২ 

আলিফ-লামÑর। একটি ফরমান। এর আয়াতগুলো পাকাপোক্ত এবং বিস্তারিতভাবে বিবৃত হয়েছে, এক পরম প্রজ্ঞাময় ও সর্বজ্ঞ সত্তার পক্ষ থেকে। সূরা হুদ - ২

আলিফ-লামÑর। এগুলো এমন কিতাবের আয়াত যা নিজের বক্তব্য পরিস্কারভাবে বর্ননা করে। ইউসুফ -১।

চ্যালেঞ্জ----  বাকারা - ২৩,  হুদ - ১৩, বনী ইসরাঈল - ৮৮, 

পূর্ব কিতাবের উপর বিশ^াস- 

তিনি তোমার ওপর এই কিতাব নাযিল করেছেন, যা সত্যের বাণী বহন করে এনেছে এবং আগের কিতাবগুলোর সত্যতা প্রমাণ করেছে। এর আগে তিনি মানুষের হিদায়াতের জন্য তাওরাত ও ইঞ্জিল নাযিল করেছিলেন। আর তিনি মানদন্ড নাযিল করেছেন (যা সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করে দেয়)। সূরা আল ইমরান - ৩

আর স্মরণ করো ঈসা ইবনে মারইয়ামের সেই কথা যা তিনি বলেছিলেন: হে বনী ঈসরাইল, আমি তোমদের কাছে আল্লাহর প্রেরিত রসূল। আমি সেই তাওরাতের সত্যতা প্রতিপাদনকারী যা আমার পূর্বে এসেছে এবং একজন রসূলের সুসংবাদদাতা যিনি আমার পরে আসবেন, যার নাম আহমাদ। সূরা আস সফ - ৬। 

কুরআনের দাবী ঃ

“রমজান মাস, এ মাসেই কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা মানবজাতির জন্য পুরোপুরি হিদায়াত এবং এমন দ¦্যর্থহীন শিক্ষা সম্বলিত, যা সত্য- সঠিক পথ দেখায় এবং হক ও বাতিলের পার্থক্য সুস্পষ্ট করে দেয়”। বাকারা- ১৮৫

“হে নবী! আমি সত্য সহকারে এই কিতাব তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আল্লাহ তোমাকে যে সঠিক পথ দেখিয়েছেন সেই অনুযায়ী তুমি লোকদের মধ্যে ফায়সালা করতে পারো। তুমি খেয়ানতকারী ও বিশ^াস ভংগকারীদের পক্ষ থেকে বিতর্ককারী হয়ো না”। আন নিসা- ১০৫।

“আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী যারা ফায়সালা করে না তারাই কাফের, জালেম, ফাসেক”। সূরা আল মা-য়েদাহ - ৪৪,৪৫,৪৭

“তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে আকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না”। সূরা আল্ ইমরান - ১০৩

“আল্লাহ এই কিতাব তোমাদের প্রতি (হুকুম) অবতীর্ন করেছেন যে, যেখানে তোমরা শুনবে আল্লাহর কোন আয়াতকে প্রত্যাখান করা হচ্ছে ও তা নিয়ে বিদ্রæপ করা হচ্ছে তোমরা সেখানে বসবে না, যতক্ষন না লোকেরা অন্য প্রসঙ্গে ফিরে আসে। অন্যথায় তোমরাও তাদের মত হবে। জেনে রাখো, নিশ্চয় আল্লাহ মুনাফিক ও কাফেরদেরকে জাহান্নামে একই জায়গায় একত্র করবেন”। সূরা আন্ নিসা - ১৪০

“তিনি সেই মহান সত্তা যিনি তাঁর রাসূলকে হিদায়াত এবং “দ্বীনে হক” দিয়ে পাঠিয়েছেন, যাতে তিনি এ দ্বীনকে অন্য সকল দ্বীনের (মতবাদের) ওপর বিজয়ী করেন, চাই তা মুশরিকদের কাছে যতই অসহনীয় হোক না কেন”। সূরা আস্ সফ- ৯

“নিশ্চয় তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের জীবনীর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। এটা তাদের জন্য, যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করে”। সূরা আহযাব- ২১

“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসূলের আনুগত্য করো এবং নিজেদের আমল ধ্বংস করো না”। সূরা মুহাম্মাদ - ৩৩

“যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করলো সে আসলে আল্লাহরই আনুগত্য করলো”। সূরা আন্ নিসা - ৮০

শিক্ষা ঃ

আল কুরআন কে নিজের জীবনের সংবিধান মেনে নিয়ে প্রকৃত ইসলামের জ্ঞান অর্জন করে আল্লাহ ও রাসূল (সা) এর পূর্ণ আনুগত্যের মাধ্যমে রাসূল (সা) কে জীবনের একমাত্র আদর্শিক নেতা হিসাবে গ্রহণ করা এবং কুরআনের দাবী অনুযায়ী আল্লাহর জমীনে আল্লাহর মনোনিত জীবন ব্যবস্থা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার মাধ্যমে আল্লাহর ক্ষমা পাওয়া।

রোযার কিছু সামাজিক শিক্ষা ঃ

১। রোযার মাধ্যমে সামাজিক অপরাধ নির্মুল হয়ে যায়।

২। খাবার থাকা সত্তেও রোযা রাখার মাধ্যমে সারাদিন না খেয়ে থাকার কষ্ট  অনুভবের মাধ্যমে গরীবদের অনাহারে থাকার কষ্ট অনুভব করা যায়।

৩। রোযার মাসে যাকাত আদায়ের মাধ্যমে বেকারত্ব ও দারিদ্রতা দুর হয়।

৪। ফেতরা আদায়ের মাধ্যমে গরীবদের সাথে রোযার ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেয়া হয়।

৫। রোযার মাসে গরীবদেরকে বেশি বেশি দানের মাধ্যমে গরীব অসহায়দের প্রতি আন্তরিকতা বৃদ্ধি পায়।


বুধবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০২১

যাদের আমল নষ্ট হয়ে যাবে

 সুরা: আল ইমরান

আয়াত নং :- ১১৭


مَثَلُ  مَا  یُنْفِقُوْنَ  فِیْ  هٰذِهِ  الْحَیٰوةِ  الدُّنْیَا  كَمَثَلِ  رِیْحٍ  فِیْهَا  صِرٌّ  اَصَابَتْ  حَرْثَ  قَوْمٍ  ظَلَمُوْۤا  اَنْفُسَهُمْ  فَاَهْلَكَتْهُؕ وَ  مَا  ظَلَمَهُمُ  اللّٰهُ  وَ  لٰكِنْ  اَنْفُسَهُمْ  یَظْلِمُوْنَ


তারা তাদের এই দুনিয়ার জীবনে যা কিছু ব্যয় করছে তার উপমা হচ্ছে এমন বাতাস যার মধ্যে আছে তুষার কণা। যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছে তাদের শস্যক্ষেতের ওপর দিয়ে এই বাতাস প্রবাহিত হয় এবং তাকে ধ্বংস করে দেয়।৯১ আল্লাহ তাদের ওপর জুলুম করেননি। বরং প্রকৃতপক্ষে এরা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করেছে।


তাফসীর : 

তাফহীমুল কুরআন:



টিকা:৯১) এই উপমাটিতে শস্যক্ষেত মানে হচ্ছে জীবন ক্ষেত্র। আখেরাতে মানুষকে তার এই জীবনক্ষেতের ফসল কাটতে হবে। বাতাস বলতে মানুষের বাহ্যিক কল্যাণাকাংখাকে বুঝানো হয়েছে। যার ভিত্তিতে কাফেররা জনকল্যাণমূলক কাজ এবং দান খয়রাত ইত্যাদিতে অর্থ ব্যয় করে থাকে। আর তূষারকণা হচ্ছে, সঠিক ঈমান ও আল্লাহর বিধান অনুসৃতির অভাব, যার ফলে তাদের সমগ্র জীবন মিথ্যায় পর্যবসিত হয়। এ উপমাটির সাহায্যে আল্লাহ‌ একথা বলতে চাচ্ছেন যে, শস্যক্ষেতের পরিচর্যার ক্ষেত্রে বাতাস যেমন উপকারী তেমনি আবার এই বাতাসের মধ্যে যদি তূষারকণা থাকে তাহলে তা শস্যক্ষেতকে সবুজ শ্যামল করার পরিবর্তে ধ্বংস করে দেয়। ঠিক তেমনি দান-খয়রাত যদিও মানুষের আখেরাতের ক্ষেতের পরিচর্যা করে কিন্তু তার মধ্যে কুফরীর বিষ মিশ্রিত থাকলে তা লাভজনক হবার পরিবর্তে মানুষের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। একথা সুস্পষ্ট যে, মানুষের মালিক হচ্ছেন আল্লাহ‌ এবং মানুষ যে ধন-সম্পদ ব্যয় করছে তার মালিকও আল্লাহ। এখন যদি আল্লাহর এই দাস তার মালিকের সার্বভৌম কর্তৃত্ব স্বীকার না করে অথবা তাঁর বন্দেগীর সাথে আর কারো অবৈধ বন্দেগী শরীক করে এবং আল্লাহ‌ প্রদত্ত সম্পদ ব্যয় করে ও তাঁর রাজ্যের মধ্যে চলাফেরা ও বিভিন্ন কাজ কারবার করে তাঁর আইন ও বিধানের আনুগত্য না করে, তাহলে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত তার এ সমস্ত কাজ অপরাধে পরিণত হয়। প্রতিদান পাওয়া তো দূরের কথা বরং এই সমস্ত অপরাধ তার বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা দায়ের করার ভিত্তি সরবরাহ করে। তার দান খয়রাতের দৃষ্টান্ত হচ্ছেঃ কোন চাকর যেন তার মনিবের অনুমতি ছাড়াই তার অর্থ ভাণ্ডারের দরজা খুলে নিজের ইচ্ছামত যেখানে সঙ্গত মনে করলো সেখানে ব্যয় করে ফেললো।



ফী জিলালিল কুরআন:


এরশাদ হচ্ছে, “যারা কুফরী করে তাদের ধনৈশ্বর্য ও সন্তান সন্তুতি আল্লাহর কাছে কখনও কোনো কাজে লাগবে না। তারা জাহান্নামবাসী, ....... এই পার্থিব জীবনে তারা যা ব্যয় করে, তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে হিমশীতল কিছু বায়ু ..... ।” (আয়াত ১১৬-১৭) এভাবেই এ সত্যটি কোরআনের চমকপ্রদ বাচনভংগীর প্রকাশের মধ্য দিয়ে একে একটি চলন্ত ও জীবন দৃশ্যরূপে অংকিত হয়েছে, তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি তাদেরকে আল্লাহর পাকড়াও থেকে রক্ষা করতে পারবে না, তা তাদেরকে আযাব থেকে বাচানোর জন্য মুক্তিপণ হবারও যোগ্য হবে না। তারা দোযখেরই অধিবাসী হবে। তারা নিজেদের যতো ধন-সম্পদই দান করুক না কেন তা বৃথা যাবে ও বিনষ্ট হবে। এমনকি তারা যদি এই দান করাকে সৎ কাজ ও পূণ্য কাজ মনে করে, তবু তাতে কোনো লাভ হবে না। ঈমানের সাথে যুক্ত না হলে কোনো সৎকাজ সৎকাজ বলেই গণ্য হবে না। কিন্তু আমরা যে ভাবে এ কথাটি ব্যক্ত করি কোরআন কিন্তু সে ভাবে ব্যক্ত করে না। কোরআন এটাকে একটি জীবন্ত ও প্রাণবন্ত দৃশ্যের ছবিতে অংকন করে। কোরআনের অংকিত এ দৃশ্যের প্রতি দৃষ্টি দিলে আমরা দেখতে পাই, আমরা যেন একটা উর্বর ও শস্য-শ্যামল ক্ষেতের সামনে দাড়িয়ে আছি। হঠাৎ ঠান্ডা ও তুষারময় হীমশীতল ঝড় শস্যক্ষেত্রটাকে ধ্বংস করে দেয়। এখানে ব্যবহৃত “সিররুন' শব্দটির ধনাত্মক রূপ এমনই যেন তা প্রচন্ড জোরে নিক্ষিপ্ত কোনো বস্তুর ঝংকার দ্বারা তার আযাবকে বাস্তবায়িত করার দৃশ্য তুলে ধরছে, আর তাতেই যেন গোটা শস্যক্ষেত্রটি বিধ্বস্ত ও বিরান হয়ে যাচ্ছে।এখানে এমন একটি মুহূর্তের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে যাতে মুহুর্তেই সংঘটিত হয়ে যায় ধ্বংস ও বিনাশ । মুহূর্তের সর্বনাশা ঝড়ে পুরো শস্যক্ষেত্র নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এটা হচ্ছে দুনিয়াবী জীবনে কাফেরদের দানশীলতার উদাহরণ । যাকে দৃশ্যত সৎকর্ম ও পুণ্যকর্ম বলেই প্রতীয়মান হয়। ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতিসহ যে সব নেয়ামত তাদের অধিকারে রয়েছে তার উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে যে, এর সবই ধ্বংসের মুখে নিপতিত হবে । তা দ্বারা কোনো সুফলই পাওয়া যাবে না। 'আল্লাহ তাদের ওপর কোনো যুলুম করেননি, বরং তারাই নিজেদের ওপর যুলুম করেছে ।' কেননা, তারাই আল্লাহর বিধান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে যে বিধান ছিলো যাবতীয় কল্যাণ ও পুণ্যের আধার ও উৎস। যে বিধান যাবতীয় সৎকাজকে একটা সঠিক ও নির্ভুল গন্তব্যের সাথে যুক্ত করে দিয়েছিলো, যে বিধানের একটা সুবিদিত পথ ও প্রণালী রয়েছে। তারা নিজেদের জন্যে নিজেরাই বিপথগামিতা এবং আল্লাহর অটুট রশির রক্ষাব্যবস্থা থেকে স্খলিত হওয়ার পথকে বেছে নিয়েছে। তাই যখন তাদের সকল সংকর্ম এমনকি দৃশ্যত সৎ উদ্দেশ্যে করা সকল দান পর্যন্ত বৃথা চলে গেলো, ধ্বংস হয়ে গেলো, তখন কোনো সহায়-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি আর তাদের কোনোই কাজে লাগলো না। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো যুলুম ছিলো না। এটা ছিলো তাদের নিজেদের ওপর নিজেদেরই যুলুম । নিজেরাই গোমরাহী ও ভ্রষ্টতাকে বেছে নিয়ে নিজেদের পায়ে নিজেরাই কুঠারাঘাত করেছিলো । এ কথাগুলো থেকে স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে, কোনো চেষ্টা সাধনা বা কর্মকান্ডের কোনো ফল বা মূল্য থাকে না- যতক্ষণ তা ঈমানের সাথে যুক্ত না হয় এবং তার পেছনে ঈমানী প্রেরণা সক্রিয় না থাকে। এটা স্বয়ং আল্লাহর ঘোষণা ৷ এর পর মানুষের কিছু বলার অবকাশ নেই । আল্লাহর এ সিদ্ধান্ত নিয়ে কেবল তারাই বাদানুবাদ করতে পারে যারা আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে কোনো জ্ঞান, কোনো দীপ্তিময় গ্রন্থের সহায়তা ছাড়া শুধু বাদানুবাদ করতেই অভ্যস্ত ।


শনিবার, ২ জানুয়ারি, ২০২১

সৎ কাজের দুনিয়া ও আখেরাতে পুরস্কারের ঘোষনা।

 সুরা: নাহল

আয়াত নং :-97



مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّنْ ذَكَرٍ اَوْ اُنْثٰى وَ هُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْیِیَنَّهٗ حَیٰوةً طَیِّبَةًۚ وَ لَنَجْزِیَنَّهُمْ اَجْرَهُمْ بِاَحْسَنِ مَا كَانُوْا یَعْمَلُوْنَ


পুরুষ বা নারী যে-ই সৎকাজ করবে, সে যদি মু’মিন হয়, তাহলে তাকে আমি দুনিয়ায় পবিত্র-পরিচ্ছন্ন জীবন দান করবো এবং (আখেরাতে) তাদের প্রতিদান দেবো তাদের সর্বোত্তম কাজ অনুসারে।


তাফসীর : 


১।এ আয়াতে মু’মিন ও কাফের উভয় দলের এমন সব সংকীর্ণচেতা ও বেসবর লোকদের ভুল ধারণা দূর করা হয়েছে, যারা মনে করে সততা, ন্যায়পরায়ণতা, বিশ্বস্ততা ও পবিত্রতা-পরিচ্ছন্নতার পথ অবলম্বন করলে মানুষের পরকালে সাফল্য অর্জিত হলেও তার পার্থিব জীবন ধ্বংস হয়ে যায়। তাদের জবাবে আল্লাহ বলছেন, তোমাদের এ ধারণা ভুল। এ সঠিক পথ অবলম্বন করলে শুধু পরকালীন জীবনই সুগঠিত হয় না, দুনিয়াবী জীবনও সুখী সমৃদ্ধিশালী হয়। যারা প্রকৃতপক্ষে ঈমানদার, পবিত্র-পরিচ্ছন্ন এবং লেনদেনের ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত ও সৎ তাদের পার্থিব জীবন, বেঈমান ও অসৎকর্মশীল লোকদের তুলনায় সুস্পষ্টভাবে ভাল ও উন্নত হয়। নিজেদের নিষ্কলঙ্ক চরিত্রের কারণে তারা যে প্রকৃত সম্মান ও প্রতিপত্তি লাভ করেন তা অন্যেরা লাভ করতে পারে না। যেসব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও উত্তম সাফল্য তারা লাভ করে থাকেন তাও অন্যেরা লাভ করতে পারে না। কারণ অন্যদের প্রতিটি সাফল্য হয় নোংরা ও ঘৃণিত পদ্ধতি অবলম্বনের ফসল। সৎলোকেরা ছেঁড়া কাঁথায় শয়ন করেও যে মানসিক প্রশান্তি ও চিন্তার স্থৈর্য লাভ করেন তার সামান্যতম অংশও প্রাসাদবারী বেঈমান দুষ্কৃতিকারী লাভ করতে পারে না।



২) আখেরাতে তাদের মর্যাদা তাদের সর্বোত্তম কর্মের প্রেক্ষিতে নির্ধারিত হবে। অন্য কথায় যে ব্যক্তি দুনিয়ায় ছোট বড় সব রকমের সৎকাজ করে থাকবে তাকে তার সবচেয়ে বড় সৎকাজের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চতম মর্যাদা দান করা হবে।



শনিবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০২০

This is me



 

মতবিরোধ

 সুরা: নাহল

আয়াত নং :-93

টিকা নং:93, 94, 


وَ لَوْ شَآءَ اللّٰهُ لَجَعَلَكُمْ اُمَّةً وَّاحِدَةً وَّ لٰكِنْ یُّضِلُّ مَنْ یَّشَآءُ وَ یَهْدِیْ مَنْ یَّشَآءُؕ وَ لَتُسْــٴَـلُنَّ عَمَّا كُنْتُمْ تَعْمَلُوْنَ


যদি (তোমাদের মধ্যে কোন মতবিরোধ না হোক) এটাই আল্লাহর ইচ্ছা হতো তাহলে তিনি তোমাদের সবাইকে একই উম্মতে পরিণত করতেন।৯৩ কিন্তু তিনি যাকে চান গোমরাহীর মধ্যে ঠেলে দেন এবং যাকে চান সরল সঠিক পথ দেখান। ৯৪ আর অবশ্যই তোমাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে তোমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।


তাফসীর : 

টিকা:৯৩) এটা পূর্ববর্তী বক্তব্যের আরো একটু বিস্তারিত ব্যাখ্যা। এর অর্থ হচ্ছে, যদি কেউ নিজেকে আল্লাহর পক্ষের লোক মনে করে ভাল-মন্দ উভয় পদ্ধতিতে নিজের ধর্মের (যাকে সে আল্লাহর প্রেরিত ধর্ম মনে করছে) প্রসার এবং অন্যের ধর্মকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টা চালায়, তাহলে তার এ প্রচেষ্টা হবে সরাসরি আল্লাহর ইচ্ছা ও উদ্দেশ্য বিরোধী। কারণ মানুষের ধর্মীয় মতবিরোধের ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়ে যদি সমস্ত মানুষকে ইচ্ছায় অনিচ্ছায় একটি ধর্মের অনুসারী বানানোই আল্লাহর উদ্দেশ্য হাতো তাহলে এজন্য আল্লাহর নিজের “তথাকথিত” পক্ষের লোকের লেলিয়ে দেয়ার এবং তাদের নিকৃষ্ট অস্ত্রের সাহায্য নেবার কোন প্রয়োজন ছিল না। এ কাজ তো তিনি নিজের সৃজনী ক্ষমতার মাধ্যমে করতে পারতেন। তিনি সবাইকে মু’মিন ও অনুগত হিসেবে সৃষ্টি করতেন এবং তাদের থেকে কুফরী ও গোনাহ করার ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতেন। এরপর ঈমান ও আনুগত্যের পথ থেকে একচুল পরিমাণ সরে আসার ক্ষমতা কারো থাকতো না।


টিকা:৯৪) অর্থাৎ আল্লাহ‌ নিজেই মানুষকে নির্বাচন ও গ্রহণ করার স্বাধীনতা দিয়েছেন। তাই দুনিয়ায় মানুষদের পথ বিভিন্ন। কেউ গোমরাহীর দিকে যেতে চায় এবং আল্লাহ‌ গোমরাহীর সমস্ত উপকরণ তার জন্য তৈরী করে দেন। কেউ সত্য-সঠিক পথের সন্ধানে ব্যাপৃত থাকে এবং আল্লাহ‌ তাকে সঠিক পথনির্দেশনা দানের ব্যবস্থা করেন।



বৃহস্পতিবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২০

আশ্লীলতা থেকে বেচে থাকার নির্দেশ

 সুরা: নাহল

আয়াত নং :-90

টিকা নং:88, 89, 


اِنَّ اللّٰهَ یَاْمُرُ بِالْعَدْلِ وَ الْاِحْسَانِ وَ اِیْتَآئِ ذِی الْقُرْبٰى وَ یَنْهٰى عَنِ الْفَحْشَآءِ وَ الْمُنْكَرِ وَ الْبَغْیِۚ یَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُوْنَ


আল্লাহ ন্যায়-নীতি, পরোপকার ও আত্মীয়-স্বজনদেরকে দান করার হুকুম দেন৮৮ এবং অশ্লীল-নির্লজ্জতা ও দুষ্কৃতি এবং অত্যাচার-বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেন।৮৯ তিনি তোমাদের উপদেশ দেন, যাতে তোমরা শিক্ষালাভ করতে পারো।


তাফসীর : 




টিকা:৮৮) এ ছোট্ট বাক্যটিতে এমন তিনটি জিনিসের হুকুম দেয়া হয়েছে যেগুলোর ওপর সমগ্র মানব সমাজের সঠিক অবকাঠামোতে ও চরিত্রে প্রতিষ্ঠিত থাকা নির্ভরশীল। 


প্রথম জিনিসটি হচ্ছে আদল বা ন্যায়পরতা। দু’টি স্থায়ী সত্যের সমন্বয়ে এর ধারণাটি গঠিত। এক, লোকদের মধ্যে অধিকারের ক্ষেত্রে ভারসাম্য ও সমতা থাকতে হবে। দুই, প্রত্যেককে নির্দ্বিধায় তার অধিকার দিতে হবে। আমাদের ভাষায় এ অর্থ প্রকাশ করার জন্য “ইনসাফ” শব্দ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কিন্তু এ শব্দটি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। এ থেকে অনর্থক এ ধারণা সৃষ্টি হয় যে, দু’ব্যক্তির মধ্যে “নিসফ” “নিসফ” বা আধাআধির ভিত্তিতে অধিকার বন্টিত হতে হবে। তারপর এ থেকেই আদল ও ইনসাফের অর্থ মনে করা হয়েছে সাম্য ও সমান ভিত্তিতে অধিকার বণ্টন। এটি সম্পূর্ণ প্রকৃতি বিরোধী। আসলে “আদল” সমতা বা সাম্য নয় বরং ভারসাম্য ও সমন্বয় দাবী করে। কোন কোন দিক দিয়ে “আদল” অবশ্যই সমাজের ব্যক্তিবর্গের মধ্যে সাম্য চায়। যেমন নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে। কিন্তু আবার কোন কোন দিক দিয়ে সাম্য সম্পূর্ণ “আদল” বিরোধী। যেমন পিতা-মাতা ও সন্তানের মধ্যে সামাজিক ও নৈতিক সাম্য এবং উচ্চ পর্যায়ের কর্মজীবি ও নিম্ন পর্যায়ের কর্মজীবীদের মধ্যে বেতনের সাম্য। কাজেই আল্লাহ যে জিনিসের হুকুম দিয়েছেন তা অধিকারের মধ্যে সাম্য নয় বরং ভারসাম্য ও সমন্বয় প্রতিষ্ঠা। এ হুকুমের দাবী হচ্ছে এই যে, প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার নৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, আইনগত, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার পূর্ণ ঈমানদারীর সাথে আদায় করতে হবে। 


দ্বিতীয় জিনিসটি হচ্ছে ইহ্সান বা পরোপকার তথা সদাচার, ঔদার্যপূর্ণ ব্যবহার, সহানুভূতিশীল আচরণ, সহিষ্ণুতা, ক্ষমাশীলতা পারস্পরিক সুযোগ সুবিধা দান, একজন অপর জনের মর্যাদা রক্ষা করা, অন্যকে তার প্রাপ্যের চেয়ে বেশী দেয়া এবং নিজের অধিকার আদায়ের বেলায় কিছু কমে রাযী হয়ে যাওয়া--- এ হচ্ছে আদলের অতিরিক্ত এমন একটি জিনিস যার গুরুত্ব সামষ্টিক জীবনে আদলের চাইতেও বেশী। আদল যদি হয় সমাজের বুনিয়াদ তাহলে ইহসান হচ্ছে তার সৌন্দর্য ও পূর্ণতা। আদল যদি সমাজকে কটুতা ও তিক্ততা থেকে বাঁচায় তাহলে ইহসান তার মধ্যে সমাবেশ ঘটায় মিষ্ট মধুর স্বাদের। কোন সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তি সর্বক্ষণ তার অধিকার কড়ায় গণ্ডায় মেপে মেপে আদায় করতে থাকবে এবং তারপর ঐ নির্দিষ্ট পরিমাণ অধিকার আদায় করে নিয়েই তবে ক্ষান্ত হবে, আবার অন্যদিকে অন্যদের অধিকারের পরিমাণ কি তা জেনে নিয়ে কেবলমাত্র যতটুকু প্রাপ্য ততটুকুই আদায় করে দেবে, এরূপ কট্টর নীতির ভিত্তিতে আসলে কোন সমাজ টিকে থাকতে পারে না। এমনি ধরনের একটি শীতল ও কাঠখোট্টা সমাজে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত থাকবে না ঠিকই কিন্তু ভালবাসা, কৃতজ্ঞতা, ঔদার্য, ত্যাগ, আন্তরিকতা, মহানুভবতা ও মঙ্গলাকাংখার মত জীবনের উন্নত মূল্যবোধগুলোর সৌন্দর্য সুষমা থেকে সে বঞ্চিত থেকে যাবে। আর এগুলোই মূলত এমন সব মূল্যবোধ যা জীবনে সুন্দর আবহ ও মধুর আমেজ সৃষ্টি করে এবং সামষ্টিক মানবীয় গুণাবলীকে বিকশিত করে। 


তৃতীয় যে জিনিসটির এ আয়াতে হুকুম দেয়া হয়েছে সেটি হচ্ছে আত্মীয়-স্বজনদেরকে দান করা এবং তাদের সাথে সদাচার করা। এটি আত্মীয়-স্বজনদের সাথে ইহসান করার একটি বিশেষ ধরণ নির্ধারণ করে। এর অর্থ শুধু এই নয় যে, মানুষ নিজের আত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহার করবে, দুঃখে ও আনন্দে তাদের সাথে শরীক হবে এবং বৈধ সীমানার মধ্যে তাদের সাহায্যকারী ও সহায়ক হবে। বরং এও এর অর্থের অন্তর্ভুক্ত যে, প্রত্যেক সমর্থ ব্যক্তি নিজের ধন-সম্পদের ওপর শুধুমাত্র নিজের ও নিজের সন্তান-সন্ততির অধিকার আছে বলে মনে করবে না বরং একই সঙ্গে নিজের আত্মীয়-স্বজনদের অধিকারও স্বীকার করবে। আল্লাহর শরীয়াত প্রত্যেক পরিবারের সচ্ছল ব্যক্তিবর্গের ওপর এ দায়িত্ব অর্পণ করেছে যে, তাদের পরিবারের অভাবী লোকেরা যেন অভুক্ত ও বস্ত্রহীন না থাকে। তার দৃষ্টিতে কোন সমাজের এর চেয়ে বড় দুর্গতি আর হতেই পারে না যে, তার মধ্যে বসবাসকারী এক ব্যক্তি প্রাচুর্যের মধ্যে অবস্থান করে বিলাসী জীবন যাপন করবে এবং তারই পরিবারের সদস্য তার নিজের জ্ঞাতি ভাইয়েরা ভাত-কাপড়ের অভাবে মানবেতর জীবন যাপন করতে থাকবে। ইসলাম পরিবারকে সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান গণ্য করে এবং এক্ষেত্রে এ মূলনীতি পেশ করে যে, প্রত্যেক পরিবারের গরীব ব্যক্তিবর্গের প্রথম অধিকার হয় তাদের পরিবারের সচ্ছল ব্যক্তিবর্গের ওপর, তারপর অন্যদের ওপর তাদের অধিকার আরোপিত হয়। আর প্রত্যেক পরিবারের সচ্ছল ব্যক্তিবর্গের ওপর প্রথম অধিকার আরোপিত হয় তাদের গরীব আত্মীয়-স্বজনদের, তারপর অন্যদের অধিকার তাদের ওপর আরোপিত হয়। এ কথাটিই নবী ﷺ তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন। তাই বিভিন্ন হাদীসে পরিষ্কার বলে দেয়া হয়েছে, মানুষের ওপর সর্বপ্রথম অধিকার তার পিতা-মাতার, তারপর স্ত্রী-সন্তানদের, তারপর ভাই-বোনদের, তারপর যারা তাদের পরে নিকটতর এবং তারপর যারা তাদের পরে নিকটতর। এ নীতির ভিত্তিতেই হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু একটি ইয়াতীম শিশুর চাচাত ভাইদেরকে তার লালন পালনের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে বাধ্য করেছিলেন। তিনি অন্য একজন ইয়াতীমের পক্ষে ফায়সালা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, যদি এর কোন দূরতম আত্মীয়ও থাকতো তাহলে আমি তার ওপর এর লালন পালনের দায়িত্ব অপরিহার্য করে দিতাম। অনুমান করা যেতে পারে, যে সমাজের প্রতিটি পরিবার ও ব্যক্তি (Unit) এভাবে নিজেদের ব্যক্তিবর্গের দায়িত্ব নিজেরাই নিয়ে নেয় সেখানে কতখানি অর্থনৈতিক সচ্ছলতা, কেমন ধরনের সামাজিক মাধুর্য এবং কেমনতর নৈতিক ও চারিত্রিক পুতঃ পবিত্র, পরিচ্ছন্ন ও উন্নত পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে।



টিকা:৮৯) ওপরের তিনটি সৎ কাজের মোকাবিলায় আল্লাহ তিনটি অসৎ কাজ করতে নিষেধ করেন। এ অসৎকাজগুলো ব্যক্তিগত পর্যায়ে ব্যক্তিবর্গকে এবং সামষ্টিক পর্যায়ে সমগ্র সমাজ পরিবেশকে খারাপ করে দেয়। 


প্রথম জিনিসটি হচ্ছে অশ্লীলতা-নির্লজ্জতা (فَحْشَاءِ) । সব রকমের অশালীন, কদর্য ও নির্লজ্জ কাজ এর অন্তর্ভুক্ত। এমন প্রত্যেকটি খারাপ কাজ যা স্বভাবতই কুৎসিত, নোংরা, ঘৃণ্য ও লজ্জাকর। তাকেই বলা হয় অশ্লীলতা। যেমন কৃপণতা, ব্যভিচার, উলংগতা, সমকামিতা, মুহররাম আত্মীয়কে বিয়ে করা, চুরি, শরাব পান, ভিক্ষাবৃত্তি, গালাগালি করা, কটু কথা বলা ইত্যাদি। এভাবে সর্ব সম্মুখে বেহায়াপনা ও খারাপ কাজ করা এবং খারাপ কাজকে ছড়িয়ে দেয়াও অশ্লীলতা-নির্লজ্জতার অন্তর্ভুক্ত। যেমন মিথ্যা প্রচারণা, মিথ্যা দোষারোপ, গোপন অপরাধ জনসমক্ষে বলে বেড়ানো, অসৎকাজের প্ররোচক গল্প, নাটক ও চলচ্চিত্র, উলংগ চিত্র, মেয়েদের সাজগোজ করে জনসমক্ষে আসা, নারী পুরুষ প্রকাশ্যে মেলামেশা এবং মঞ্চে মেয়েদের নাচগান করা ও তাদের শারীরিক অংগভংগীর প্রদর্শনী করা ইত্যাদি। 


দ্বিতীয়টি হচ্ছে দুষ্কৃতি (مُنْكَرِ) । এর অর্থ হচ্ছে এমন সব অসৎ কাজ যেগুলোকে মানুষ সাধারণভাবে খারাপ মনে করে থাকে, চিরকাল খারাপ বলে আসছে এবং আল্লাহর সকল শরীয়াত যে কাজ করতে নিষেধ করেছে। 


তৃতীয় জিনিসটি জুলুম-বাড়াবাড়ি (بَغْيِ) । এর মানে হচ্ছে, নিজের সীমা অতিক্রম করা এবং অন্যের অধিকার তা আল্লাহর হোক বা বান্দার হোক লংঘন করা ও তার ওপর হস্তক্ষেপ করা।



বুধবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২০

কেয়ামতে সবার বিপক্ষে স্বাক্ষী থাকবে

 সুরা: নাহল

আয়াত নং :-89

টিকা নং:86, 87, 


وَ یَوْمَ نَبْعَثُ فِیْ كُلِّ اُمَّةٍ شَهِیْدًا عَلَیْهِمْ مِّنْ اَنْفُسِهِمْ وَجِئْنَا بِكَ شَهِیْدًا عَلٰى هٰۤؤُلَآءِؕ وَ نَزَّلْنَا عَلَیْكَ الْكِتٰبَ تِبْیَانًا لِّكُلِّ شَیْءٍ وَّ هُدًى وَّ رَحْمَةً وَّ بُشْرٰى لِلْمُسْلِمِیْنَ۠


(হে মুহাম্মাদ! এদেরকে সেই দিন সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে দাও) যেদিন আমি প্রত্যেক উম্মাতের মধ্যে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে একজন সাক্ষী দাঁড় করিয়ে দেবো, যে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে এবং এদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবার জন্য আমি তোমাকে নিয়ে আসবো। (আর এ সাক্ষ্যের প্রস্তুতি হিসেবে) আমি এ কিতাব তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যা সব জিনিস পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে৮৬ এবং যা সঠিক পথনির্দেশনা, রহমত ও সুসংবাদ বহন করে তাদের জন্য যারা আনুগত্যের শির নত করে দিয়েছে। ৮৭


তাফসীর : 

তাফহীমুল কুরআন:



টিকা:৮৬) অর্থাৎ এমন প্রত্যেকটি জিনিস পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে, যার ওপর হিদায়াত ও গোমরাহী এবং লাভ ও ক্ষতি নির্ভর করে, যা জানা সঠিক পথে চলার জন্য একান্ত প্রয়োজন এবং যার মাধ্যমে হক ও বাতিলের পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভুলক্রমে কিছু কিছু তাফসীর লেখক تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ বাক্যাংশটি এবং এর সম-অর্থবোধক আয়াতগুলোর অর্থ করে এভাবে যে, কুরআনে সবকিছু বর্ণনা করা হয়েছে। তারপর তারা নিজেদের এ বক্তব্য সত্য প্রমাণ করার জন্য কুরআন থেকে বিজ্ঞান ও টেকনোলজির অদ্ভূত অদ্ভূত বিষয়বস্তু টেনে বের করতে থাকে।



টিকা:৮৭) অর্থাৎ যারা আজ এ কিতাবটি মেনে নেবে এবং আনুগত্যের পথ অবলম্বন করবে এ কিতাব জীবনের সব ক্ষেত্রে তাদেরকে সঠিক পথ দেখাবে, একে অনুসরণ করে চলার কারণে তাদের প্রতি আল্লাহর রহমত বর্ষিত হবে এবং এ কিতাব তাদেরকে এ সুসংবাদ দেবে যে, চূড়ান্ত ফায়সালার দিন আল্লাহর আদালত থেকে তারা সফলকাম হয়ে বের হয়ে আসবে। অন্যদিকে যারা এ কিতাব মানবে না তারা যে কেবল হিদায়াত ও রহমত থেকে বঞ্চিত হবে তাই নয় বরং কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহর নবী তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে দাঁড়াবেন তখন এ দলীলটিই হবে তাদের একটি জবরদস্ত প্রমাণ। কারণ নবী একথা প্রামণ করে দেবেন যে, তিনি তাদেরকে এমন জিনিস দিয়েছিলেন যারা মধ্যে হক ও বাতিল এবং সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে বর্ণনা করে দেয়া হয়েছিল।



ফী জিলালিল কুরআন:


তারপর রসূলুল্লাহ(স.)-এর সাথে তাঁর জাতির ব্যবহারকে কেন্দ্র করে যে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিলাে সেই অবস্থাটাকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। এরশাদ হচ্ছে, 'আর সেই দিনকে স্মরণ করা দরকার যে দিন আমি, আল্লাহ তায়ালা, প্রত্যেক জাতির মধ্য থেকে একজন সাক্ষ্য দানকারীকে.... রহমত এবং সকল মুসলমানের জন্যে যা সুসংবাদ দানকারী।'(আয়াত ৮৯) এখানে মােশরেকদের যে পরিণতির কথা উল্লেখিত হয়েছে তার আলােকে এবং কেয়ামতের ওই ভয়ংকর দিনে তখন কাফেররা তাদের অলীক দেব-দেবী বা সমাজ পতিদের কাছ থেকে সকল প্রকার সম্পর্ক মুক্তির ঘােষণা দেবে, সেই অবস্থার প্রেক্ষাপটে এবং যখন ওই সব ব্যক্তিত্ব যাদের আল্লাহর সাথে শরীক করা হলে, তারা যখন এই অপরাধের ব্যাপারে তাদের অজ্ঞতার কথা জানাবে তখনকার করুণ ও অসহায় অবস্থাকে সামনে রেখেই মক্কার কোরায়শদের সাথে রসূলুল্লাহ(স.)-এর অবস্থাকে পরিমাপ করা হয়েছে, 'যেদিন প্রত্যেক উম্মত থেকেই একজন সাক্ষ্যদানকারীকে বের করে আনা হবে' অর্থাৎ, সময় মতােই এ অবস্থা তার সকল বিভীষিকা নিয়ে হাযির হয়ে যাবে, আর একই সময়ে। 'হে রসূল, তােমাকেও আনা হবে জাতির ব্যাপারে সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে।...' এরপর জানানাে হচ্ছে যে, 'যে কিতাব রসূলের কাছে এসেছে, তা সব কিছুর ব্যাপারে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দানকারী।...' অতএব, এ কিতাব নাযিল হওয়ার পর আর কারাে কোনাে তর্কবিতর্ক করার সুঘােগ নেই। এবং কোনাে ব্যক্তির কোনাে ওযর ওজুহাত দেখানাের মতােও কোনো অবকাশ নেই, কারণ মুসলমানদের জন্যে এ কিতাব 'হেদায়াত ও রহমত'। অতএব হেদায়াত ও রহমত যে পেতে চাইবে তার প্রথম কাজ হচ্ছে, ওই কঠিন ও ভয়ংকর দিন আসার পূর্বেই আল্লাহর কাছে পরিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে তার হুকুম মতাে জীবন যাপন করা। আর এইভাবে কোরআন মজীদে, আলােচ্য বিষয়টিকে যথাযথভাবে হৃদয়গ্রাহী করার জন্যে কেয়ামতের দৃশ্যাবলী তুলে ধরা হচ্ছে, যেন এ দৃশ্যাবলীর বিবরণ বাস্তব ছবির মতাে মানুষের অন্তর্দৃষ্টিতে ফুটে উঠে তাকে সত্যের দিকে এগিয়ে দিতে পারে।


সোমবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০২০

কাফেরদের শাস্তি

সুরা: নাহল
আয়াত নং :-88

اَلَّذِیْنَ كَفَرُوْا وَ صَدُّوْا عَنْ سَبِیْلِ اللّٰهِ زِدْنٰهُمْ عَذَابًا فَوْقَ الْعَذَابِ بِمَا كَانُوْا یُفْسِدُوْنَ

যারা নিজেরাই কুফরীর পথ অবলম্বন করেছে এবং অন্যদেরকে আল্লাহর পথ থেকে ফিরিয়েছে তাদেরকে আমি আযাবের পর আযাব দেবো, দুনিয়ায় তারা যে বিপর্যয় সৃষ্টি করতো তার বদলায়।

তাফসীর : 

  *কেয়ামতের ময়দানে নেতা ও জনগণের ঝগড়া :  এরপর কোরআন আমাদের সামনে কেয়ামতের ময়দানের একটি দৃশ্য চিত্রায়ন করছে। আজকের যারা মূর্তিপূজা কিংবা কাউকে অন্ধ অনুসরণ কিংবা কাউকে অদৃশ্যের বিষয়ে জ্ঞানী কিংবা নিজেদের জন্যে আইন কানুন রচনা করার অধিকার দিয়ে আল্লাহর সাথে শরীক করছে এইসব মােশরেক এবং শরীকদের মাঝে ঝগড়ার দৃশ্যটি আমাদের সামনে তুলে ধরে। 'যে দিন আমি প্রত্যেক সম্প্রদায় থেকে একজন করে সাক্ষী দাড় করাবাে... যারা অস্বীকার করেছে এবং আল্লাহর রাস্তায় আসা থেকে মানুষকে বাধা দিয়েছে, তাদের ওপর আমি আযাবের ওপর আযাব বাড়িয়ে দেব যেসব অশান্তিকর কাজ তারা করতে থেকেছে, তারই প্রতিদান স্বরূপ তাদেরকে দেয়া হবে এ আযাব।'(আয়াত ৮৪-৮৮) ওপরের আয়াতগুলােতে নবীদের দায়িত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, সকল নবীই তাদের জাতির মধ্য থেকে এগিয়ে আসা ঈমানদারদেরকে সাথে নিয়ে দাওয়াতী কাজ করতে গিয়ে নানা প্রকার সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন এবং দুনিয়ার জীবনে নানা প্রকার দুঃখ কষ্টের মধ্যে অব্যাহতভাবে তাবলিগী কাজ চালিয়ে গিয়েছেন। আয়াতে যারা জেনে বুঝে সত্যকে অস্বীকার করেছিলাে তাদের করুণ অবস্থাও ফুটে উঠেছে। যারা সত্যের বিরােধিতা করেছিলাে এবং সত্যকে উৎখাত করার জন্যে তাদের সমস্ত শক্তি প্রয়ােগ করেছিলাে, তাদের সম্পর্কে এ প্রসংগে জানানাে হচ্ছে যে, কেয়ামতের দিন আত্মপক্ষ সমর্থন করার উদ্দেশ্যে তাদেরকে কোনাে যুক্তি তর্ক পেশ করার সুযােগ দেয়া হবে না, তাদের পক্ষে কারাে সুপারিশও গ্রহণ করা হবে না এবং সে দিন কোনাে কাজ বা কথা দিয়ে তাদের রবের করুণাপূর্ণ দৃষ্টি আকর্ষণেরও কোনাে সুযােগ দেয়া হবে না। প্রকৃতপক্ষে মৃত্যুর সাথে সাথে পরিমাপ করা তওবা করা বা নিজেদেরকে শােধরানাের সকল সুযােগ শেষ হয়ে যাবে। মৃত্যুর পর শুধু হিসাব নিকাশ হওয়া ও পুরস্কার বা শাস্তি গ্রহণ করা ছাড়া অন্য সকল প্রকার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। তাই এরশাদ হচ্ছে, 'যখন যালেমরা আযাব দেখতে শুরু করবে তখন তাদের আযাবকে কোনাে প্রকার হালকা করাও হবে না অথবা তাদের অবস্থাকে কোনােভাবেই পুনর্বিবেচনা করা হবে না।' ওপরের আয়াতগুলােতে এরপর দেখা যায়, বর্ণনা ধারা কেটে গিয়ে আসছে সেসব মােশরেকদের দৃশ্য যারা আল্লাহর ক্ষমতায় অন্যদের অংশীদার করে এবং তাদের দাসত্ব করতাে, তাদের বানিয়ে দেয়া আইন কানুন মানতাে। সেসব শরীকদেরকে দেখিয়ে তারা আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত এর কাছে আরয করবে, বলবে, ‘হে আমাদের রব, ওই হচ্ছে আমাদের সেই সব মাবুদ যাদেরকে আপনার ক্ষমতার অংশীদার বলে মনে করতাম এবং আপনাকে বাদ দিয়ে তাদেরকেই আমরা সাহায্যের জন্যে ডাকতাম।' রােজ হাশরের দিন ওরা নিজেদের দোষ স্বীকার করে নিয়েই তারা একথা বলবে, অথচ এর আগে দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে তারা তাদেরকে আল্লাহর শরীক বানিয়ে নিয়েছিলাে। সাধারণ মানুষের এই দুর্বলতার সুযােগ নিয়ে সমাজের নেতারা, নিজ নিজ স্বার্থে জনগণকে এমনভাবে ভেড়া বানিয়ে রাখতে যে স্বাধীনভাবে কোনাে চিন্তা করার সুযােগও তাদেরকে দিতাে না। নানা প্রকার ভয় দেখিয়ে, অর্থনৈতিক চাপে রেখে ও তাদের মধ্যে বিভিন্ন অন্ধবিশ্বাস সৃষ্টি করে নিজেদের কথা মানতে তাদেরকে বাধ্য করতাে এবং বিভিন্নভাবে বিভিন্ন কৌশলে তারা নিজেদের হাতে কর্তৃত্ব ধরে রাখতাে। তাদেরকে বুঝাতাে, 'বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহু দূর।' নিজেদের স্বার্থে মানুষের ওপর এই যুলুম প্রচন্ডভাবে নাড়া দিয়েছিলাে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনকে। আফ্রিকার নিগ্রোদেরকে ধরে এনে যখন আমেরিকার ধনকুবেররা অসহায় দাসে পরিণত করছিলাে এবং স্থানীয় নিগ্রোদেরকে যখন তারা অন্যান্য আমেরিকানদের মতাে নাগরিক স্বাধীনতা দিচ্ছিলাে না তখন আব্রাহাম লিংকন উদাত্ত কণ্ঠে বলে উঠেছিলেন, 'Man was born free; but everywhere he is in chains. আর কেয়ামতের দিন ওই দেব দেবীদের সম্পর্কে এই আইন প্রনেতা বিধান দাতা নেতাদের সম্পর্কে ওরা বলবে না যে, ওরা আল্লাহর শরীক, বরং বলবে 'ওরা আমাদের শরীক অর্থাৎ আমরা আমাদের অন্ধত্বের কারণে ওদেরকে আল্লাহর শরীক বলে মনে করতাম। সে দিন কিন্তু ওইসব শরীকরা অর্থাৎ ওইসব ধর্ম যাজক বা সমাজপতিরা যারা মানুষকে ভুলের মধ্যে রেখে তাদের কাছ থেকে অন্ধভাবে তাদের আনুগত্য করতে বাধ্য করতাে এই মারাত্মক ধোকাবাজি করার অপরাধে লিপ্ত থাকার কথা স্মরণ করে ভয়ে কাঁপতে থাকবে। কেয়ামতের ওই কঠিন দিনে তার মুখােমুখি হবে তাদের ওইসব অন্ধভক্ত দাসদের যারা সেদিন সকল ভয়ের উর্ধে উঠে যাবে এবং তাদের মুখের ওপর কথা ছুড়ে দিয়ে তারা বলে উঠবে, তোমরা, অবশ্যই তােমরা মহামিথ্যাবাদী। এসময় তারা আল্লাহর দিকে মুখ করে আত্মসমর্পণ করবে এবং অনুনয় বিনয় করতে থাকবে। এরশাদ হচ্ছে, 'তারা সেদিন আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করবে এবং তাদের উদ্ভাবিত সকল কথা সেদিন নিষ্ফল হয়ে যাবে।' অর্থাৎ মােশরেকরা তাদের এইসব মনগড়া কাজ কর্মের কারণে এমন কোনাে কিছুর অধিকারী হবে না, যার বিনিময়ে সেই কঠিন দিনে তারা শান্তি থেকে মুক্তি পেতে পারে। এরশাদ হচ্ছে, 'সেদিন সে সব কিছু নিস্ফল হয়ে যাবে যা কিছু মনগড়া ও মিথ্যা তারা তৈরী করে বলতে এবং অনুসরণ করতাে। এ কথার ওপর এখানে আলােচনা শেষ হচ্ছে যে, কুফরী যারা করেছিলাে অপরকে কুফরী করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলাে এবং মানুষকে সত্যপথ গ্রহণ করায় বাধা দিয়েছিলাে তাদেরকে দ্বিগুন আযাব দেয়া হবে। এরশাদ হচ্ছে, 'যারা কুফুরী করেছিলাে আর মানুষকে আল্লাহর পথে আসা থেকে বাধা দিয়েছিলাে, উপর্যুপরি আযাব দিয়ে তাদের কষ্ট আরো বাড়িয়ে দেবাে, যেহেতু তারা (পৃথিবীর বুকে) বিশৃংখলা ও অশান্তি সৃষ্টি করতে থেকেছে।' অর্থাৎ কুফুরী করা অর্থাৎ আল্লাহর অস্তিত্বে অবিশ্বাস অথবা তার আইন বাদ দিয়ে নিজেরা আইন তৈরী করে মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়া-ই হলাে সবচেয়ে বড় ফাসাদ বড়াে কুফরী, এই কুফুরীই হলাে সকল বিশৃংখলা ও অশাস্তির মূল-এ বিষয়ে যে কোনাে চিন্তাই একটি বিপর্যয়, আর এহেন বিশ্বাসের গােলমালের কারণে তারা বাস্তবে বহু কুফরী কাজে লিপ্ত রয়েছে, যার ফল শুধু অশান্তিই অশান্তি এবং এটাই এক বিরাট অপরাধ। দ্বিতীয় অপরাধটি হচ্ছে অপরকে হেদায়াতের পথ থেকে সরিয়ে রাখা-এজন্যে তাদেরকে যহুশুণ বেশী আযাব দেয়া হবে। সকল জনপদের জন্যেই এটা সাধারণ অবস্থা। অর্থাৎ, যে কোনাে ব্যক্তি ওপরে বর্ণিত মতে অন্যায় কাজ করবে তাদের সবার অবস্থা একই হবে।

পাইলসের হোমিও চিকিৎসা Piles Treatment

https://youtu.be/1mz15phzlL4