সুরা: নাহল
আয়াত নং :-88
اَلَّذِیْنَ كَفَرُوْا وَ صَدُّوْا عَنْ سَبِیْلِ اللّٰهِ زِدْنٰهُمْ عَذَابًا فَوْقَ الْعَذَابِ بِمَا كَانُوْا یُفْسِدُوْنَ
যারা নিজেরাই কুফরীর পথ অবলম্বন করেছে এবং অন্যদেরকে আল্লাহর পথ থেকে ফিরিয়েছে তাদেরকে আমি আযাবের পর আযাব দেবো, দুনিয়ায় তারা যে বিপর্যয় সৃষ্টি করতো তার বদলায়।
তাফসীর :
*কেয়ামতের ময়দানে নেতা ও জনগণের ঝগড়া : এরপর কোরআন আমাদের সামনে কেয়ামতের ময়দানের একটি দৃশ্য চিত্রায়ন করছে। আজকের যারা মূর্তিপূজা কিংবা কাউকে অন্ধ অনুসরণ কিংবা কাউকে অদৃশ্যের বিষয়ে জ্ঞানী কিংবা নিজেদের জন্যে আইন কানুন রচনা করার অধিকার দিয়ে আল্লাহর সাথে শরীক করছে এইসব মােশরেক এবং শরীকদের মাঝে ঝগড়ার দৃশ্যটি আমাদের সামনে তুলে ধরে। 'যে দিন আমি প্রত্যেক সম্প্রদায় থেকে একজন করে সাক্ষী দাড় করাবাে... যারা অস্বীকার করেছে এবং আল্লাহর রাস্তায় আসা থেকে মানুষকে বাধা দিয়েছে, তাদের ওপর আমি আযাবের ওপর আযাব বাড়িয়ে দেব যেসব অশান্তিকর কাজ তারা করতে থেকেছে, তারই প্রতিদান স্বরূপ তাদেরকে দেয়া হবে এ আযাব।'(আয়াত ৮৪-৮৮) ওপরের আয়াতগুলােতে নবীদের দায়িত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, সকল নবীই তাদের জাতির মধ্য থেকে এগিয়ে আসা ঈমানদারদেরকে সাথে নিয়ে দাওয়াতী কাজ করতে গিয়ে নানা প্রকার সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন এবং দুনিয়ার জীবনে নানা প্রকার দুঃখ কষ্টের মধ্যে অব্যাহতভাবে তাবলিগী কাজ চালিয়ে গিয়েছেন। আয়াতে যারা জেনে বুঝে সত্যকে অস্বীকার করেছিলাে তাদের করুণ অবস্থাও ফুটে উঠেছে। যারা সত্যের বিরােধিতা করেছিলাে এবং সত্যকে উৎখাত করার জন্যে তাদের সমস্ত শক্তি প্রয়ােগ করেছিলাে, তাদের সম্পর্কে এ প্রসংগে জানানাে হচ্ছে যে, কেয়ামতের দিন আত্মপক্ষ সমর্থন করার উদ্দেশ্যে তাদেরকে কোনাে যুক্তি তর্ক পেশ করার সুযােগ দেয়া হবে না, তাদের পক্ষে কারাে সুপারিশও গ্রহণ করা হবে না এবং সে দিন কোনাে কাজ বা কথা দিয়ে তাদের রবের করুণাপূর্ণ দৃষ্টি আকর্ষণেরও কোনাে সুযােগ দেয়া হবে না। প্রকৃতপক্ষে মৃত্যুর সাথে সাথে পরিমাপ করা তওবা করা বা নিজেদেরকে শােধরানাের সকল সুযােগ শেষ হয়ে যাবে। মৃত্যুর পর শুধু হিসাব নিকাশ হওয়া ও পুরস্কার বা শাস্তি গ্রহণ করা ছাড়া অন্য সকল প্রকার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। তাই এরশাদ হচ্ছে, 'যখন যালেমরা আযাব দেখতে শুরু করবে তখন তাদের আযাবকে কোনাে প্রকার হালকা করাও হবে না অথবা তাদের অবস্থাকে কোনােভাবেই পুনর্বিবেচনা করা হবে না।' ওপরের আয়াতগুলােতে এরপর দেখা যায়, বর্ণনা ধারা কেটে গিয়ে আসছে সেসব মােশরেকদের দৃশ্য যারা আল্লাহর ক্ষমতায় অন্যদের অংশীদার করে এবং তাদের দাসত্ব করতাে, তাদের বানিয়ে দেয়া আইন কানুন মানতাে। সেসব শরীকদেরকে দেখিয়ে তারা আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত এর কাছে আরয করবে, বলবে, ‘হে আমাদের রব, ওই হচ্ছে আমাদের সেই সব মাবুদ যাদেরকে আপনার ক্ষমতার অংশীদার বলে মনে করতাম এবং আপনাকে বাদ দিয়ে তাদেরকেই আমরা সাহায্যের জন্যে ডাকতাম।' রােজ হাশরের দিন ওরা নিজেদের দোষ স্বীকার করে নিয়েই তারা একথা বলবে, অথচ এর আগে দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে তারা তাদেরকে আল্লাহর শরীক বানিয়ে নিয়েছিলাে। সাধারণ মানুষের এই দুর্বলতার সুযােগ নিয়ে সমাজের নেতারা, নিজ নিজ স্বার্থে জনগণকে এমনভাবে ভেড়া বানিয়ে রাখতে যে স্বাধীনভাবে কোনাে চিন্তা করার সুযােগও তাদেরকে দিতাে না। নানা প্রকার ভয় দেখিয়ে, অর্থনৈতিক চাপে রেখে ও তাদের মধ্যে বিভিন্ন অন্ধবিশ্বাস সৃষ্টি করে নিজেদের কথা মানতে তাদেরকে বাধ্য করতাে এবং বিভিন্নভাবে বিভিন্ন কৌশলে তারা নিজেদের হাতে কর্তৃত্ব ধরে রাখতাে। তাদেরকে বুঝাতাে, 'বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহু দূর।' নিজেদের স্বার্থে মানুষের ওপর এই যুলুম প্রচন্ডভাবে নাড়া দিয়েছিলাে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনকে। আফ্রিকার নিগ্রোদেরকে ধরে এনে যখন আমেরিকার ধনকুবেররা অসহায় দাসে পরিণত করছিলাে এবং স্থানীয় নিগ্রোদেরকে যখন তারা অন্যান্য আমেরিকানদের মতাে নাগরিক স্বাধীনতা দিচ্ছিলাে না তখন আব্রাহাম লিংকন উদাত্ত কণ্ঠে বলে উঠেছিলেন, 'Man was born free; but everywhere he is in chains. আর কেয়ামতের দিন ওই দেব দেবীদের সম্পর্কে এই আইন প্রনেতা বিধান দাতা নেতাদের সম্পর্কে ওরা বলবে না যে, ওরা আল্লাহর শরীক, বরং বলবে 'ওরা আমাদের শরীক অর্থাৎ আমরা আমাদের অন্ধত্বের কারণে ওদেরকে আল্লাহর শরীক বলে মনে করতাম। সে দিন কিন্তু ওইসব শরীকরা অর্থাৎ ওইসব ধর্ম যাজক বা সমাজপতিরা যারা মানুষকে ভুলের মধ্যে রেখে তাদের কাছ থেকে অন্ধভাবে তাদের আনুগত্য করতে বাধ্য করতাে এই মারাত্মক ধোকাবাজি করার অপরাধে লিপ্ত থাকার কথা স্মরণ করে ভয়ে কাঁপতে থাকবে। কেয়ামতের ওই কঠিন দিনে তার মুখােমুখি হবে তাদের ওইসব অন্ধভক্ত দাসদের যারা সেদিন সকল ভয়ের উর্ধে উঠে যাবে এবং তাদের মুখের ওপর কথা ছুড়ে দিয়ে তারা বলে উঠবে, তোমরা, অবশ্যই তােমরা মহামিথ্যাবাদী। এসময় তারা আল্লাহর দিকে মুখ করে আত্মসমর্পণ করবে এবং অনুনয় বিনয় করতে থাকবে। এরশাদ হচ্ছে, 'তারা সেদিন আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করবে এবং তাদের উদ্ভাবিত সকল কথা সেদিন নিষ্ফল হয়ে যাবে।' অর্থাৎ মােশরেকরা তাদের এইসব মনগড়া কাজ কর্মের কারণে এমন কোনাে কিছুর অধিকারী হবে না, যার বিনিময়ে সেই কঠিন দিনে তারা শান্তি থেকে মুক্তি পেতে পারে। এরশাদ হচ্ছে, 'সেদিন সে সব কিছু নিস্ফল হয়ে যাবে যা কিছু মনগড়া ও মিথ্যা তারা তৈরী করে বলতে এবং অনুসরণ করতাে। এ কথার ওপর এখানে আলােচনা শেষ হচ্ছে যে, কুফরী যারা করেছিলাে অপরকে কুফরী করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলাে এবং মানুষকে সত্যপথ গ্রহণ করায় বাধা দিয়েছিলাে তাদেরকে দ্বিগুন আযাব দেয়া হবে। এরশাদ হচ্ছে, 'যারা কুফুরী করেছিলাে আর মানুষকে আল্লাহর পথে আসা থেকে বাধা দিয়েছিলাে, উপর্যুপরি আযাব দিয়ে তাদের কষ্ট আরো বাড়িয়ে দেবাে, যেহেতু তারা (পৃথিবীর বুকে) বিশৃংখলা ও অশান্তি সৃষ্টি করতে থেকেছে।' অর্থাৎ কুফুরী করা অর্থাৎ আল্লাহর অস্তিত্বে অবিশ্বাস অথবা তার আইন বাদ দিয়ে নিজেরা আইন তৈরী করে মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়া-ই হলাে সবচেয়ে বড় ফাসাদ বড়াে কুফরী, এই কুফুরীই হলাে সকল বিশৃংখলা ও অশাস্তির মূল-এ বিষয়ে যে কোনাে চিন্তাই একটি বিপর্যয়, আর এহেন বিশ্বাসের গােলমালের কারণে তারা বাস্তবে বহু কুফরী কাজে লিপ্ত রয়েছে, যার ফল শুধু অশান্তিই অশান্তি এবং এটাই এক বিরাট অপরাধ। দ্বিতীয় অপরাধটি হচ্ছে অপরকে হেদায়াতের পথ থেকে সরিয়ে রাখা-এজন্যে তাদেরকে যহুশুণ বেশী আযাব দেয়া হবে। সকল জনপদের জন্যেই এটা সাধারণ অবস্থা। অর্থাৎ, যে কোনাে ব্যক্তি ওপরে বর্ণিত মতে অন্যায় কাজ করবে তাদের সবার অবস্থা একই হবে।
২টি মন্তব্য:
আল্লাহ আমাদের মাফ করুন। আমীন
আল্লাহ মাফ করুন। আমীন
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন